ফ্রিল্যান্সিং

ফ্রিল্যান্সিং- এ বেশিরভাগ মানুষ সফল হতে পারছেনা কেন?

আগের আর্টিকেলে বলেছিলাম ফ্রিল্যান্সিং জিনিসটা কি এবং এই সম্পর্কিত ভুল ধারণাগুলা সম্পর্কে।

পড়ে না থাকলে অবশ্যই পড়ে আসবেন আর্টিকেলটি, কারণ ওই আর্টিকেল এর সাথে এই আর্টিকেলটি অনেক সম্পর্কিত এবং আগের পর্বটি না পড়ে থাকলে এই পর্বের অনেক কিছু বুঝতে সমস্যা হতে পারে আপনার।

যাই হোক, আগের পর্ব যদি পড়ে থাকেন, তাহলে আপনাদের মনে থাকার কথা যে আমরা যে সচরাচর ফ্রিল্যান্সিং বলতে যা বুঝি সেটি আসলে আইটি ফ্রিল্যান্সিং, এবং আমাদের কথা হয়েছিল যে আমরা এখন থেকে আর ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি ব্যবহার না করে আইটি ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি ব্যবহার করব, মনে আছে কি?

আমরা সেই কথাতে বহাল থাকতে চাই এই আর্টিকেলেও।

তো যাই হোক, অনেকের ধারণা আইটি ফ্রিল্যান্সিং জিনিসটি খুবই সহজ এবং যাকে দিয়ে কোন কিছুই হবে না, মানে গতানুগতিক পড়াশোনা এবং চাকুরি বা ব্যবসা, সে আইটি ফ্রিল্যান্সিং করবে। আমি আপনাদের বুঝিয়ে বলেছিলাম কেন কথাটি অত্যন্ত ভুল, এবং এ সম্পর্কিত বাস্তব দিগ গুলি তুলে ধরেছিলাম।

আরো একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা ছিল আগের আর্টিকেলে। সেটি হচ্ছে, কেন আইটি ফ্রিল্যান্সিং- এ এসে বেশিরভাগ মানুষ সফল হতে পারছেনা এবং হতাশ হয়ে পড়ছে? কেনই বা সফলতার হার এত কম? আবার কেন্ই বা যারা  সফল হচ্ছে তাদের ইনকাম এত বেশি ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব এই পর্বে । আসুন দেখা যাক কেন আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ বেশিরভাগ মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে এবং হতাশ হয়ে পড়ছে?

প্রথমতই বলব, আগের আর্টিকেলটি পড়ে থাকলে এতক্ষনে বুঝে গেছেন আইটি ফ্রিল্যান্সিং মোটেই একটি সহজ পেশা নয়। কিন্তু যারা এ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত নয় তারা জিনিসটাকে অনেক বেশি সহজ মনে করে এ পেশায় আসছে। এবং এখানেই হয়ত সবচেয়ে বড় কমিউনিকেশন গ্যাপটি ঘটছে।

আপনি এমন একটি কাজ করতে নামলেন যেটা আপনি মনে করেন খুব সহজ, এবং সেই কাজ থেকে ইনকাম অনেক বেশি। সে হিসাবে আপনি শুরূ করার আগেই আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। কিন্তু কাজে নামার পর আপনি দেখলেন কাজটি আসলে এতটা সহজ নয়, এবং যে রকম ইনকাম আশা করেছিলেন, তার কিছুই হচ্ছেনা, তা হলে কি এরকম অবস্থায় আপনি হতাশ হয়ে পড়বেন না ?

ঠিক এই জিনিসটিই হচ্ছে আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর ক্ষেত্রে। কাজটি সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে মানুষ পেশাটিতে আসছে এবং ভুল মাইন্ডসেটের কারণে অনেক ভুল করছে যার কারণে তারা ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে পড়ছে।

এখন দেখা যাক, ভুল ধারণা নিয়ে আসার কারণে মানুষ ঠিক কি কি ভুল গুলি করছে এবং তার পরিণামে কি হচ্ছে!

যথাযথভাবে কাজ না শেখা:

আমি মানুষের মুখে এটাও শুনেছি, অনলাইনে নাকি ক্লিক করেই টাকা উপার্জন করা যায়। এর থেকে হাস্যকর আর কিছু  হতে পারে?

এই সমস্ত অদ্ভুত ধারণার কারণে মানুষ মনে করে ইন্টারনেট কোন কাজই শেখা লাগে না, বরং এমনি এমনি টাকা চলে আসে। যার কারণে তারা কাজ শেখায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।

কিন্তু আসল সত্যটা আমার কাছ থেকে শুনুন। আপনাকে অবশ্যই অবশ্যই আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর কোন একটি কাজে ভালভাবে পারদর্শী হতে হবে, খুবই ভালভাবে। মানুষ তখনই আপনাকে টাকা দেবে যখন আপনি আপনার স্কিলের মাধ্যমে তাদের কোন একটি কাজ করে দিবেন।

এসব ক্লিক ফ্লিক করে টাকা উপার্জন করা যায় এগুলো ভুয়া কথা ছাড়া কিছুই নয়। এগুলা যে কেন আল্টিমেট ভুয়া কথা সেই যুক্তি একটু পরে পাবেন।

তো যাই হোক, আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে টাকা উপার্জন করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর যেকোন একটি সেক্টরের কাজে পারদর্শী হতে হবে, এবং সেজন্য আপনাকে সেই কাজটি খুবই ভালভাবে আয়ত্ত করতে হবে।

এখন কথা হচ্ছে, যথাযথভাবে কাজ শেখার জন্য নিচের  তিনটি জিনিসের প্রয়োজন?

১। রিসোর্স

২। সময়

৩। ডেডিকেশন ও ধৈর্য

রিসোর্স : রিসোর্স মানে হচ্ছে যেটি দেখে কাজ শিখবেন, বা যে উৎস থেকে কাজ শিখবেন। এটি হতে পারে ইন্টারনেট বের্সড ফ্রি রিসোর্স, যেমন  গুগল, ইউটিউব এগুলা। আজকাল যেকোন বিষয়ের পর্যাপ্ত পরিমাণ রিসোর্স গুগল ইউটিউবে পাওয়া যায়।

আবার হতে পারে ইন্টারনেটে কোন পেইড কোর্স করা, মানে টাকা দিয়ে কোন কোর্স কিনে সেটি ফলো করা। ইন্টারনেটে ইউডেমি, লিন্ডা ইত্যাদি বিভিন্ন প্লাটফর্ম আছে যেখানে পেইড কোর্স কিনতে পাওয়া যায় অনেক স্বনামধন্য এক্সপার্টদের – এ ধরণের একটি ভাল কোর্স কেনা যেতে পারে।

আবার লোকালি কোচিং করাও যেতে পারে। বাংলাদেশে কিছু ট্রেইনিং ইন্সটিউট আছে যেখানে গ্রাফিক্স ডিজাইন, অয়েব ডেভেলপেন্ট, এসইও ইত্যাদি কাজ শেখানো হয়। এরকম যেকোন একটি প্রতিষ্টানে কাজ শেখা যেতে পারে। তবে অবশ্যই ভাল মানের রেপুটেবল একটি প্রতিষ্ঠান সিলেক্ট করতে হবে যারা হালনাগাদ ত্যর্থ দিতে সক্ষম। অনেক নামজাদা ভুয়া প্রতিষ্ঠান আছে যারা নিজেরা ইনকাম করতে না পেরে মানুষকে শেখানোর নাম করে আয় করে। এসব প্রতিষ্ঠান এভয়েড করতে হবে। ভাল মানের একটি প্রতিষ্টানে কাজ শেখা যেতে পারে।

অনেকে রিকমেন্ড করে কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ না শিখে বা কোন কোর্স না করে গুগল ইউটিউব দেখে দেখে কাজ শিখতে। হ্যা এটা একটা অপশন হতে পারে, যদি আপনি সম্পূর্ন বিনা খরচে শিখতে চান। তবে সত্যি বলতে, আমি এটি রিকমেন্ড করি না, এবং তার যথাযথ কারণ আছে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি নিজে কোন কোর্স করি নাই বা কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রেইনিং নেই নাই। এতে করে হয়েছে কি, আমার সময় অনেক বেশি লেগেছে এবং নিজের ওপর অনেক বেশি স্ট্রেস গেছে। তার কারণ হচ্ছে, অনলাইনে ফ্রি ম্যাটেরিয়াল আছে ঠিকই, কিন্তু তা ছড়ানো ছিটানো।

এগুলা খুজে বের করে একত্রিতভাবে শেখা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। এছাড়া আরো একটি বড় কারণ, যথাযথ গাইডলাইনের অভাব। অনলাইনে ম্যাটেরিয়াল আছে ঠিকই কিন্তু কোনটার পরে কি শিখতে হবে, কেন শিখতে হবে, এসব নিয়ে আপনি তেমন কোন সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন পাবেন না। এতে করে আপনি প্রায়ই হতাশ হয়ে পড়বেন এবং মনে করবেন যে যা শিখছি ঠিক শিখছি তো? এভাবেই কি শিখতে হবে? বা সঠিক পথে আছি তো?

তাই আপনি যদি সুপরিচিত কোর্স কেনেন বা প্রতিষ্টানে শিক্ষা নেন – সেটাকে তুলনা করতে পারেন মানুষের হাড়ের সাথে – অর্থাৎ কোর স্ট্রাকচার বা কঙ্কাল এর সাথে। কোর্স টা করা মানে আপনার কঙ্কাল দাঁড়িয়ে গেল, কোর বা ব্যসিক জিনিসটা বুঝতে পারলেন – কি, কেন, কিভাবে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর পেলেন।

এরপর আপনার কাজ হবে ইন্টারনেটের বিভিন্ন সোর্স থেকে বিভিন্ন ছোট ছোট জিনিস শিখতে থাকা এবং আপনার জ্ঞানের কঙ্কালে মাংস বাড়াতে থাকা, মানে ব্যসিক এর সাথে বিভিন্ন এডিশনাল জিনিস শিখতে থাকা।

তবে সেটি যদি একান্তই না পারেন, তাহলে আমি বলব কোন একজন মেন্টর খুজে বের করতে, যে আপনাকে সঠিক গাইডলাইন দিবে, কিভাবে কি করতে হবে সেটা বলে দিবে, কোনটার পর কোনটা শিখতে হবে জানিয়ে দেবে, এবং আপনি ইন্টারনেট ঘেঁটে সেটার টিউটোরিয়াল বের করে সেটা শিখতে পারবেন।

সময়: তার পরের জিনিসটি হচ্ছে সময় ঐযে বলেছিলাম, মানুষ মনে করে কোন কাজ না করেই ইন্টারনেট থেকে টাকা উপার্জন করা যায়। তো এই চিন্তাভাবনার কারণে তারা মনেই করে না যে ইন্টারনেটে কাজ শেখার জন্য অনেক  সময় দেয়া প্রয়োজন।

একজন নতুন মানুষ যখন এই পেশায় আসে, তখন সে অনেক ব্যস্ততা ও আকাশকুসুম স্বপ্ন নিয়ে আসে। সে চায় খুব দ্রুত প্রচুর টাকা উপার্জন করতে। তখন তার কাছে ৬ মাস সময় ও যেন অনেক বেশি সময় মনে হয় এবং সে এটুকু সময় কাজ শেখার পেছনে দিতে নারাজ থাকে।

এখন কথা হচ্ছে, আমরা কত বছর ধরে পড়াশোনা করি? ১৫-১৭ বছর মিনিমাম, রাইট? তো আমরা ১৫ বছরের বেশি সময় পড়াশোনা করে ২০-২৫ হাজার টাকার চাকরি পেলেই খুশি, কিন্তু যে কাজের মাধ্যমে তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণ উপার্জন করা সম্ভব সে কাজে আমরা ১৫ মাস সময় দিতেও নারাজ।

যাই হোক, আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর যেকোন কাজ শেখার জন্যই আপনাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। কাজের ধরণ অনুযায়ী সময়ের পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। যেমন ডাটা এন্ট্রি বা ওই ধরনের কাজ শিখতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না, এবং স্বভাবতই সেটাতে ইনকাম কম।

আবার গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখতে ৩-৫ মাস সময় প্রয়োজন, এবং ইনকামও তুলনামূলক বেশি। সেখানে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ভালভাবে শিখতে গেলে আরো বেশি সময়ের প্রয়োজন, কারণ এটি তুলনামুলকভাবে একটি বিস্তৃত সেক্টর। এখানে অনেক ল্যাঙ্গুয়েজ শেখা লাগে এবং আমি মনে করে মিনিমাম ১ বছর সময় দরকার ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ভালভাবে শিখতে গেলে।

তো মোদ্দা কথা হচ্ছে, আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর যে কাজটিই শিখতে চান না কেন, সেটির পেছনে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার মানষিকতা আপনার থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, ডেডিকেশন ধৈর্য। আচ্ছা কম্পিউটারে বসতে বা টুকটাক কাজ করতে কি আপনার মজা লাগে? যদি লেগে থাকে তাহলে বলছি, যখন প্রফেশনাল কাজ করতে বা শিখতে বসবেন, তখন এই মজা পালিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

আমারো প্রথম দিকে কম্পিউটার জিনিসটা খুব মজা লাগত। কম্পিউটার ওপেন করবার জন্য সবসময় মুখিয়ে থাকতাম। কিন্তু সেই জিনিসটা আস্তে আস্তে চলে যেতে শুরু করল যখন আমি প্রফেশনাল কাজ শেখা শুরু করলাম। কারণ, অনলাইনে হোক বা অফলাইনে, কাজ কিন্তু কাজ-ই। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আনন্দদায়ক নয়।

তো এই আনন্দহীনতার পরেও কাজটি শেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার যে জিনিসটি দরকার সেটি হচ্ছে ডেডিকেশন। কাজটিকে আপনার ভালবাসতে হবে এবং যেভাবেই হোক শেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। কাজই যেন হয় আপনার প্রথম প্রায়োরিটি।

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে ধৈর্য। অনেক সময় কাজ শেখার মাঝখানে মনে হবে যা শিখছি তা দিয়ে আসলেই কিছু হবে কিনা? বা  তাৎক্ষনিক  কোন রেজাল্ট না দেখতে পেলে ছেড়ে দিতে মন চাইবে। এটা কোনভাবেই করা যাবে না। ধৈর্য ধরে শেষের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, তবেই রেজাল্ট দেখতে পাবেন।

কমিউনিকেশন স্কিলের অভাব

‘সফট স্কিল’ – এই টার্মটির সাথে আপনারা পরিচিত? সফট স্কিল বলতে বোঝায় এমন কিছু স্কিল যা যেকোন কাজ করার প্রয়োজনীয় প্রধান স্কিলের সাথে দরকার হয়।

মনে করেন আপনাকে একটি গ্রুপ এসাইনমেন্ট সাবমিট করতে হবে। এখন সেই এসাইনমেন্ট সাবমিট করার জন্য আপনাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা রাখার পাশাপাশি আরো কিছু কাজ করতে হবে। যেমন – যেহেতু এটি গ্রুপ ওয়ার্ক,  তাই আপনাকে গ্রুপের সাথে বসে আলোচনা করে সমাধান বের করার ক্যাপাবিলিটি রাখতে হবে।

কিভাবে একটা গ্রুপে মিলেমিশে কাজ করা যায় সেটি জানতে  হবে। এছাড়া হয়ত মাইক্রোসফট অফিসের টুকটাক কাজ জানতে হবে এসাইনমেন্টটি এডিট করার জন্য। এই যাবতীয় স্কিল গুলি সফট স্কিল হিসাবে বিবেচিত হবে এই ক্ষেত্রে।

এরকম কিছু কমন সফট স্কিল আছে যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হবে আপনাদের। এই স্কিল গুলির  মধ্যে অন্যতম হচ্ছে – কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ করতে পারার স্কিল।

আমি মনে করি, আমাদের মানে বাংলাদেশিদের মধ্যে সার্বিকভাবে এই স্কিলটির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, যেটা আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর ক্ষেত্রে বেশি প্রকট।

কারণ, আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে দুটি অন্তরায়, প্রথমত কমিউনিকেশন স্কিল, যেমন কখন কোথায় কোন কথা বলতে হয়, কিভাবে বলতে হয়, কিভাবে মানুষকে কনভিন্স করতে হয় এসব স্কিল না থাকা, দ্বিতীয়ত, ইংরাজি ভাল্  ভাবে না জানা।

দেখুন, আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ আপনার সব ক্লায়েন্ট ই হবে বাইরের দেশের, যারা ইংরাজিতে কথা বলে। এখন আপনার যদি ইংরাজির উপর যথাযথ দক্ষতা না থাকে, তাহলে আপনি তাদের সাথে সহজ ও স্বাবলিল ভাবে কমিউনিকেট কিভাবে করবেন?

অনর্গল ইংরাজি বলতে পারা লাগবে না আপনার, এটলিস্ট কিভাবে ফ্লুয়েন্টলি ইংরাজিতে লিখতে হয়, এটলিস্ট কীভাবে আপনি যা বলতে চাচ্ছেন সেটা বোঝাতে হয়, এগুলা তো জানা লাগবেই। ক্লায়েন্ট এর সাথে আপনার যোগাযোগ সঠিক  না হলে আপনার কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।

এজন্য, আপনাকে দুটো কাজ করতে হবে। প্রথমত, ইংরাজি শেখার উপর জোর দিতে হবে। আপনি যদি নিয়ম করে প্রতিদিন কিছুটা সময় ইংরাজি পড়েন, ধরুণ আপনি যে ফিল্ডে কাজ করছেন সেই ফিল্ডে কোন একটা টপিকে ইংরাজিতে লেখা কিছু আর্টিকেল পড়লেন, যে শব্দগুলা নতুন সেগুলার অর্থ জেনে রাখলেন।

এছাড়া আগ্রহি আরো কয়েক জনকে নিয়ে মেসেঞ্জারে একটা গ্রুপ খুলে ফেলেন, যেখানে আপনারা  নিজেদের মধ্যে সব সময়  ইংরাজিতে কথা বলবেন, মানে টেক্সট করবেন আরকি। এরকম আরো অনেক উপায় পাবেন ইংরাজিতে নিজেকে দক্ষ করার। এবং আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে শেখা শুরুর টাইমিং।

আমি সবচেয়ে বেশি রিকমেন্ড করি যখন থেকে কাজ শেখা শুরু করবেন, তখন থেকেই ইংরাজি শেখা শুরু করবেন। আপনি যদি ৬ মাস কাজ সেখার পাশাপাশি ৬ মাস ইংরাজিও চর্চা করেন, আপনি ৬ মাস পর সবদিক থেকেই প্রস্তুত হয়ে যাবেন আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ আপনার পদচারণা শুরূ করার জন্য।

আর তাছাড়া কমিউনিকেশন স্কিল ও প্রাক্টিস করবেন প্রথম থেকেই, যাতে আপনি অলরাউন্ডার হয়ে ওঠেন। অনেক টিপস পাবেন গুগলে কমিউনেকশন স্কিল বাড়ানোর জন্য, সেগুলা ফলো করুন।

দ্রুত টাকার লোভে পথভ্রষ্ট হউয়া

বলেছিলাম না, যারা আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ আসে, তারা কেমন জানি দুনিয়ার ব্যস্ততা নিয়ে আসে? তারা খুব দ্রুত বড়লোক হতে চায়? ফলশ্রুতিতে কি হয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে খুব দ্রুত। ৬ মাস সময় দিয়ে কাজ শেখার জন্য তারা প্রস্তুত থাকে না, এবং তারা খুজতে থাকে এমন কোন ওয়ে যেখানে তারা খুব দ্রুত উপার্জন করতে পারবে।

এজন্য তারা আজকে এই কাজ করে, কালকে সেই কাজ করে এবং সহজ কোন উপায় খুজতে থাকে। দেখা যায় একসময় চিন্তা করে ক্লিক করে খুব দ্রুত টাকা উপার্জন করার। আপনাদের সম্ভবত বলার কথা ছিল যে ক্লিক করে টাকা উপার্জনের চিন্তা কেন বুলশিট, সেটাই বলছি এখন –

আচ্ছা আপনি চিন্তা করুন, অনলাইনে যখন আপনি টাকা উপার্জন করবেন, তখন আপনি যে টাকাটা পাবেন, সেটি কি ছাপা হয়ে আপনার কাছে আসবে? না নিশ্চয়? বরং কেউ না কেউ আপনাকে টাকাটা পাঠাবে তাই না? হোক সেটা ডলার বা অন্য কোন কারেন্সিতে। বাট কাউকে না কাউকে তো আপনাকে টাকাটা পাঠাতে হবে তাই না?

তো এবার আপনি বলুন, আপনাকে কেউ এমনি এমনি টাকা কেন পাঠাবে? আপনি যদি তার কোন কাজ না করে দেন বা তার উপকারে না আসেন, তবে সে কেন আপনাকে টাকা পাঠাবে? আপনি ক্লিক করলে কারো কি উপকার হতে পারে যে সে আপনাকে টাকা পাঠাবে? বরং আপনি যখন কারো কোন প্রকৃত কাজ করে দেবেন, কেবলমাত্র তখনই সে আপনাকে টাকা পাঠাবে, তাই না?

এই সহজ জিনিসটিই অনেক মানুষ বুঝতে চায় নাহ। তারা মনে করে ইন্টারনেটে কোন যাদুর খনি আছে, যেটা ক্লিক করলেই টাকা পাঠায়। আপনাকে সহজ জিনিসটি বুঝতে হবে যে ইন্টারনেট শুধু একটি যোগাযোগের মাধ্যম মাত্র, যে কাজ করবে তার সাথে যে কাজ করাবে তার।

টাকা উপার্জনের ব্যাসিক যে নিয়ম – যে আপনি কারো কোন কাজ করে দেবেন বিনিময়ে সে আপনাকে টাকা দেবে – এটা সবক্ষত্রেই সঠিক।

এটা জেনে রাখুন যে খুব দ্রুত টাকা উপার্জনের এরকম কোন সৎ ও স্থায়ী রাস্তা নেই, তাই মনোনিবেশ করুন ভালভাবে কাজ শিখে তারপর টাকা উপার্জনের আশা করতে।

কন্টিনিয়াস কাজ শিখতে থাকার মেন্টালিটি না থাকা

ছোটবেলায় একটি কথা শুনতাম, যে ডাক্তার হলে নাকি সারাজীবন পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হয়, কারণ নতুন নতুন রোগ আবিষ্কার হবে, তার প্রতিষেধক আবিষ্কার হবে, সেগুলো সম্পর্কে না জানা থাকলে ভাল ডাক্তার হব কিভাবে!

এই ভয়ে ছোটবেলায় ডাক্তার হতে চাইতাম না যে সারাজীবন পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু হায়, শেষমেষ এসে সেরকম কিছুই বেছে নিলাম! আইটি ফ্রিল্যান্সিং একদমই সেরকম কিছু একটা!

আপনারা এটা বোঝেন যে আইটি ফ্রিল্যান্সিং ব্যাপারটাই টেকনোলজি কে ঘিরে, আর আপনার এটা ভাল করেই জানেন যে টেকনোলজি কি দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হয়। প্রতিদিন নতুন নতুন ফোন বের হচ্ছে, আগের ফোনগুলা তখন অকেজো মনে হচ্ছে!

ঠিক তেমনি প্রতিদিন নতুন নতুন সফটওয়্যার বের হচ্ছে, একটা কাজ হাজারভাবে করার নতুন নতুন পন্থা বের হচ্ছে। আপনি যদি এগুলা সম্পর্কে না জানেন তাহলে সময়ের সাথে টিকে থাকবেন কিভাবে?

আচ্ছা কখনো প্রেজেন্টেশন বানিয়েছেন? যদি বানিয়ে থাকেন কিসে বানিয়েছেন? নিশ্চয় পাওয়ারপয়েন্ট? কারণ প্রেজেন্টেশন শব্দটা শুনলে ওই একটা ওয়ার্ড এ হয়ত আমাদের মাথায় সবার আগে ঘোরে, তাইনা?

এটি আবার কি? প্রেজি হচ্ছে প্রেজেন্টেশন বানানোর অন্যতম সহজ ও আকর্ষণীয় ওয়েব বেজড সফটওয়্যার। পাওয়ারপয়েন্ট থেকে প্রেজি ব্যবহার করা অনেক বেশি সহজ এবং প্রেজেন্টেশন গুলাও আরো বেশি আকর্ষনীয় হয়, এবং সময় ও কম লাগে।

কিন্তু আপনার হয়ত এটার কথা জানাই ছিলো না। ভার্সিটি তে প্রেজেন্টেশন এনাউন্স হলেই আপনি তাড়াতাড়ি পাওয়ারপয়েন্ট খুলে নিয়ে বসে যেতেন এবং নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে প্রেজেন্টেশন বানাতে লেগে যেতেন, আবার হয়ত দেখা যেত যে স্লাইড মন মত হত নাহ।

কিন্তু আপনার যদি প্রেজির কথা জানা থাকত, তাহলে আপনার অনেক সময় বাচত, কষ্ট কম করা লাগত এবং স্লাইড ও সুন্দর হত, প্রফেসরের প্রশংসা ও পেতেন। কিন্তু কোনটাই হয়নি শুধুমাত্র আপনার লেটেস্ট টেকনোলজি সম্পর্কে অবগত না থাকার কারণে।

তো এই যদি লেটেস্ট টেকনোলজি সম্পর্কে অজ্ঞতার প্রভাব হয় একজন ছাত্রের জীবনে, তাহলে ভাবুন যার পেশা ই টেক কে ঘিরে, সে যদি লেটেস্ট টেক সম্পর্কে অবগত না থাকে, তাহলে তার কি অবস্থা হতে পারে?

এটা বলেই দেয়া যায় যে সে বেশিদিন মার্কেটে টিকে থাকতে পারবে না, এবং ঠিক এই জিনিশটি ঘটে আমাদের আইটি ফ্রিল্যান্সার দের সাথে। এরা প্রথমে কাজ শেখার সময় একবার কাজ শিখবে, তাও এক্সাক্টলি যা শেখান হবে সেটাই শিখবে, নিজে কোন রিসার্স করে কিছু শিখবে না, আর একবার কয়েকটা কাজ পেলে মনে করবে যা শিখেছি এবার তাই দিয়েই জীবন চালিয়ে দিব।

কিন্তু বাস্তব ঘটনা পুরা উলটা। টেকনোলজি যত দ্রুত আপডেট হবে মার্কেটও তত দ্রুত আপডেট হবে, এবং ভিন্ন ভিন্ন এস্পেক্ট এর আগমন হবে প্রতিটি ফিল্ডে। এগুলা সম্পর্কে আপনার অবশ্যই জানতে হবে নিজেকে আপডেট করার জন্য।

যেহেতু আমাদের আইটি ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে এই মানষিকতা নাই, তাই দেখা যায় তারা কিছুদিন পরেই মার্কেট থেকে ঝরে পড়ে অথবা কাজ পাওয়ার পরিমাণ সমূহভাবে কমে যায়, এবং তারা হতাশ হয়ে পড়ে। এমন সিচুয়েশন এভয়েড করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই শেখা চালিয়ে যেতে হবে, সে আপনি যত বড় আইটি ফ্রিল্যান্সারই হন না কেন!

শেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ও আপনার ইন্ডাস্ট্রি তে পরিবর্তন গুলা সম্পর্কে অবগত থাকার জন্য অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে আপনার ইন্ডাস্ট্রি এর অথরিটি ওয়েবসাইট গুলা ফলো করা। বেশিরভাগ ইন্ডাস্ট্রি এর এক্সপার্টরা ওয়েবসাইট চালায় যেখানে তারা ইন্ডাস্ট্রি এর পরিবর্তন নিয়ে কথা বলে। এসব ওয়েবসাইট আপনার অবশ্যই ফলো করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close